
চট্টগ্রাম থেকে ফেনী আসতে দেড় ঘন্টা লেগেছে। ভেতরে বসা বাস এর কয়েক যাত্রী বলাবলি
করছিল, আজ ফেনীর এক মহা নায়ক এর মৃত্যু হয়েছে। দৃস্টি ও কান দুটিই খাঁড়া করলাম। ওরা
বলছিল, গোলাপ মিয়া চৌধুরী মারা গেছেন (জনাব আজিজ আহমদ চৌধুরীর ডাক নাম)।
ফেনীর একটি অধ্যায় এর যবনিকা ঘটলো। কি সে অধ্যায়? তারাই বললো, সুস্থ ধারার রাজনীতির।
নির্মোহ থাকার রাজনীতির। সকল প্রকার লোভ লালসার উর্ধ্বে উঠে, মানুষের জন্য কিছু করার
রাজনীতির।
বাস থেকে নেমে টের পেলাম। আশ পাশটা কেমন যেন গোমরা হয়ে আছে। কারোর মুখেই হাসি
নেই। অধিকাংশ দোকান- পাট আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। ব্যস্ত শহরটি যেন আজ কাঁদছে।
বিমর্ষ শহরটি আজ তার প্রিয় অভিভাবককে হারিয়েছে। সর্বত্রই গোলাপ মিয়া চৌধুরীকে শেষ
বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে।
বেলা দুইটা। গোলাপ চৌধুরীর কফিন এর সামনে হাজারো মানুষের ঢ্ল। তার নিথর দেহ লক্ষ্য করে
মানুষের কত যে শ্রুতি বাক্য। আমি দেখছি,তার চিরচেনা সেই নির্মল হাসি, তখনও মুখে
লেগে আছে। আর ভাবছি অনেক কিছু।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুকে মহান ও সৌন্দর্যময় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
বলেছিলেন, ‘মরণ রে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান’। তিনি জীবনের প্রথম প্রভাতে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে
অমৃতের স্বরূপ বলেই আহব্বান করেছিলেন। একটি গানে তিনি বলেন, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
এ মহান নেতার শব দেহের সামনে দাঁড়িয়ে আমার ভাবনা আরো ডানা মেলে। সব মৃত্যুই বিরহের
নয়। কোন কোন মৃত্যু মহান। কারন মৃত্যু মানুষের অনন্ত ধারার অবসান সূচনা করে না। বরং নতুন
কিছু করার উদ্দীপনা দিয়ে যায়। জনাব আজিজ আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যু আমার কাছে তেমনই
মনে হয়েছে। এ শব দেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আর ভাবছি মহাত্মা গান্ধীর এক অমর বানী।
তিনি তার অনুসারীদের বলেছিলেন, এমনভাবে অধ্যয়ন করবে, যেন তোমার সময়াভাব নেই, তুমি
চিরজীবী। এমনভাবে জীবন যাত্রা নির্বাহ করবে, যেন মনে হয়,তুমি আগামীকালই মারা যাবে।
কিন্তু আজ এ চিন্তার মানুষগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু চিন্তা বাদ দিয়ে, বর্তমান এর
সুখ, বিলাস নিয়েই বেশি মেতে আছে মানুষ। যেন যুগের পরিবর্তন ঘটেছে। বেশির ভাগ মানুষই ভোগ বিলাস আর অতৃপ্তির খোলসে নিজেকে আজ আবিষ্ট করে রেখেছে। যে খোলস থেকেই উৎসারিত হয় পাপ। যা সমাজকে পংকিলতায় ঠেলে দিচ্ছে।
গোলাপ চৌধুরী তার ব্যাতিক্রম। সারাক্ষণই জনমানুষের চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন। চাওয়া- পাওয়ার
জটিল হিসেবের মধ্যে তিনি ছিলেন না। তাই পেয়েছেনও অনেক। তাঁর শব যাত্রায় ভালবাসার ঢালি নিয়ে, হাজার হাজার মানুষের সরব উপস্থিতি তারই প্রমান করে। করোনা ভীতি উপেক্ষা করে এত
মানুষের উপস্থিতি, এক বিরল ঘটনা হয়ে থাকবে।
আমার প্রিয় লেখক সমরেশ মজুদার এর একটি বাক্য এখন খুব মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন,
মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়। তা উপলব্ধি করতেন, বরেণ্য রাজনীতিবিদ আজিজ আহমেদ চৌধুরী। তিনি এটাও জানতেন, Man’s life is short but art is long. জীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্ত কর্ম দীর্ঘ। এ চিন্তা থেকেই তিনি কাজ করে গেছেন। যেন মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে থাকেন, মানুষের হৃদয়ের মনি কোঠায়। সে জায়গায়, সে ভাবনায়, তিনি সফল হয়েছেন।
জনাব আজিজ আহমেদ চৌধুরী আমার নিকট আত্বীয়। আমার বিয়ের অন্যতম উদ্যোগতা। ১৯৯৭
সাল থেকেই তাঁকে চিনি- জানি। কাছ থেকেই দেখেছি এ মহান রাজনৈতিককে। তিনি ছিলেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। আজকের অপরাজনীতির যুগে, গোলাপ চৌধুরী ছিলেন ব্যতিক্রম। মানবতা আর মানবকল্যানই ছিল তাঁর রাজনীতির অন্যতম অনুষংগ। এমন নির্মোহ রাজনীতিক যুগে যুগে জন্মায় না। জানি না, ফেনীর রাজনৈতিক অংগনের এ শূন্যতা কিভাবে পূরণ হবে। এর পরও আশায় বুক বেঁধে আছি। অবশ্যই টানেলের শেষ প্রান্তে আলোর রেখা দেখতে পাব।
পরিশেষে এ লেখার সমাপ্তি টানতে চাই নীচের ক’টি ইংরেজি বাক্য দিয়ে, Death is not
extinguishing the light; it is only putting out the lamp because the dawn has come.
#লেখক : আঞ্চলিক পরিচালক, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
- » জরিমানার অর্থ ফেরতের আদেশ
- » বাংলাদেশ সম্মিলিত শিক্ষক সমাজ ফেনী জেলা আহবায়ক কমিটি গঠিত
- » ফেনী বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ ও বিতরণ
- » আমার দেশ সম্পাদকের রত্নগর্ভা মাতা অধ্যাপিকা মাহমুদা বেগমের মাগফিরাত কামনায় ফেনীতে দোয়া
- » গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যার প্রতিবাদে ফেনীতে সাংবাদিকদের মানববন্ধন
- » ফেনীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাংবাদিকদের উপর হামলার গোপন পরিকল্পনা ফাঁস
- » জনতার অধিকার পার্টির চেয়ারম্যানের উপর হামলা, সংবাদ সম্মেলন
- » ফেনী পৌর বিএনপির সদস্য নবায়ন কর্মসূচি উদ্বোধন
- » ফেনীতে হেফাজতের দোয়া মাহফিলে আজিজুল হক ইসলামাবাদী- ‘আলেম সমাজ ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশে আর ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি হবে না’
- » ফেনীতে হাফেজ তৈয়ব রহ. স্মরণে দোয়ার মাহফিল









